যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোনোর ইঙ্গিতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় পতন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশাবাদ তৈরি হওয়ায় ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) উভয় সূচকেই তেলের দাম গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
### সূচকের বড় পতন
বাজারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৩৮ ডলার বা ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমে ৭১ দশমিক ৫৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ৯২ সেন্ট বা ১ দশমিক ৩২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৬৮ দশমিক ৫৮ ডলারে নেমেছে। উভয় সূচকের জন্যই এটি গত মার্চের পর সর্বনিম্ন দর।
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্রেন্ট তেলের দাম সামগ্রিকভাবে প্রায় ৪৫ ডলার কমেছে, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক দরপতন। একই সময়ে মার্কিন তেলের দাম কমেছে প্রায় ৩১ ডলার, যা ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারির পর সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক পতন।
### আলোচনার ইতিবাচক প্রভাব ও হরমুজ প্রণালি
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান যে, কাতারের দোহায় ইরানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদের কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা ‘খুব ভালো’ এগোচ্ছে। মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচল এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
যদিও অন্তর্বর্তী সমঝোতার ব্যাখ্যা নিয়ে দুই দেশের প্রকাশ্য অবস্থান ভিন্ন এবং বিগত সপ্তাহে একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে, তবুও আলোচনার টেবিল সচল থাকাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
স্যাক্সো ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ওলে হ্যানসেন বলেন, “দোহায় চলমান আলোচনা বাজারে সরবরাহ নিশ্চিতের বিষয়ে স্বস্তি এনেছে। ফলে তেলের দাম আরও নিচে নেমেছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।”
এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উল্লেখ করেছেন, ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল এখন যুদ্ধপূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। প্রাইস ফিউচার্স গ্রুপের বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন মনে করেন, এই সংকট পুরোপুরি কেটে গেলে বৈশ্বিক তেল উৎপাদন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পেতে পারে।
### মার্কিন বাজারে মজুতের চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) জানিয়েছে, ঘরোয়া শোধনাগারগুলোর চাহিদা বৃদ্ধির কারণে গত সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত ৩৮ লাখ ব্যারেল কমে ৪০ কোটি ৮৪ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন। তবে রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকরা ৪৫ লাখ ব্যারেল মজুত কমার যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, প্রকৃত ঘাটতি তার চেয়ে কম হওয়ায় বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
### দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস
ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হওয়ার প্রেক্ষিতে রয়টার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, টানা পাঁচ মাস বৃদ্ধির পর ২০২৬ সালের তেলের দামের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস কমিয়েছেন বিশ্লেষকরা। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির বাজার আগামী দিনগুলোতে আরও স্থিতিশীল হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।




