প্রতি বছর ১৬ সেপ্টেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি দিবস। হৃদরোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো, আধুনিক ক্যাথেটারভিত্তিক চিকিৎসাপদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরা এবং হৃদরোগ প্রতিরোধ ও সময়মতো চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি হৃদরোগের চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বিশেষায়িত শাখা। এতে সাধারণত ক্যাথেটার বা সরু নমনীয় নল ব্যবহার করে হৃদপিণ্ড ও রক্তনালির বিভিন্ন সমস্যা শনাক্ত ও চিকিৎসা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ওপেন-হার্ট সার্জারির তুলনায় এসব পদ্ধতি কম আক্রমণাত্মক এবং রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সময়ও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
যেভাবে শুরু হলো দিবসটি
১৯৭৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর চিকিৎসক আন্দ্রেয়াস গ্রুন্টজিগ প্রথম সফল করোনারি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করেন। হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী ধমনিতে জমে থাকা সংকোচন বা ব্লকেজ কমানোর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-পদ্ধতিতে পরিণত হয়।
এরপর প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিতে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন আধুনিক চিকিৎসা কৌশল। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৬ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মাধ্যমে শিক্ষা ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন উপায়ে হৃদরোগ, এর চিকিৎসা, সম্ভাব্য জটিলতা, প্রতিরোধ এবং রোগীর যত্ন বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
হৃদরোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
হৃদরোগ ও রক্তনালিসংক্রান্ত রোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে হৃদ্রোগে আনুমানিক ১ কোটি ৭৯ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ। এসব মৃত্যুর বড় অংশের সঙ্গে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের সম্পর্ক রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ঢাবিতে তিন ককটেল বিস্ফোরণ, ক্যাম্পাসে উদ্বেগ
তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি কী
ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি হলো কার্ডিওলজির এমন একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র, যেখানে ক্যাথেটারভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে হৃদপিণ্ড ও রক্তনালির রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা করা হয়।
প্রধান কয়েকটি পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে—
অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি: সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে যাওয়া করোনারি ধমনি প্রসারিত করার পদ্ধতি।
স্টেন্ট স্থাপন: ধমনি খোলা রাখতে ছোট জালের মতো একটি নল বা স্টেন্ট স্থাপন করা হয়।
আরও পড়ুনঃ আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস আজ
হার্টের ভালভের চিকিৎসা: কিছু নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে ওপেন সার্জারি ছাড়াই ক্যাথেটারের মাধ্যমে ভালভ মেরামত বা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা যায়।
অ্যাবলেশন: নির্দিষ্ট ধরনের অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দনের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্যাথেটারভিত্তিক পদ্ধতি।
এসব প্রযুক্তির ব্যবহার রোগের ধরন, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
দিবসটির গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি দিবসের মাধ্যমে হৃদরোগের লক্ষণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসা-পদ্ধতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা গবেষণা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিষয়গুলোও সামনে আসে।
দিবসটি বিশেষভাবে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়—
- হৃদরোগের ঝুঁকি ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি;
- হৃদরোগ শনাক্তকরণ ও দ্রুত চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরা;
- আধুনিক ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা-পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া;
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা;
- চিকিৎসা গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তির বিকাশকে উৎসাহ দেওয়া;
- হৃদরোগ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো।
প্রতিরোধে জীবনযাত্রার ভূমিকা
হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য পরিহার এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি।
বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘাম, মাথা ঘোরা কিংবা ব্যথা হাত, কাঁধ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া উচিত।
আরও পড়ুনঃ বিস্কিট-ব্রেডের ২০ শতাংশ দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত
আন্তর্জাতিক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি দিবস আধুনিক হৃদরোগ চিকিৎসার অগ্রগতি সম্পর্কে মানুষকে জানার সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি হৃদরোগ প্রতিরোধ, ঝুঁকি কমানো এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে সচেতন হওয়ার বার্তাও দেয়।




