আজ ২৬ আগস্ট, ফুলবাড়ী ট্রাজেডি দিবস। ২০০৬ সালের এই দিনে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কয়লা খনি প্রকল্প ও এশিয়া এনার্জির কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও গুলিতে প্রাণ হারান তিন তরুণ। আহত হন দুই শতাধিক আন্দোলনকারী। এরপর থেকে প্রতিবছর দিনটি ফুলবাড়ী ট্রাজেডি দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির প্রস্তাবিত কয়লা খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হলে কৃষিজমি, পানি, পরিবেশ ও জনবসতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সেদিন বিকেলে ফুলবাড়ী শহরের নিমতলা এলাকায় বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে ঢাকা মোড় থেকে মিছিল নিয়ে এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলে তৎকালীন বিডিআর সদস্যরা গুলি চালান বলে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এতে তরিকুল, আমিন ও সালেকিন নামে তিন তরুণ নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক মানুষ।
কীভাবে শুরু হয়েছিল ফুলবাড়ীর আন্দোলন
ফুলবাড়ী কয়লা খনি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকে। ১৯৯৪ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অস্ট্রেলীয় প্রতিষ্ঠান বিএইচপির সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়। পরবর্তী সময়ে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে প্রস্তাবিত কয়লা খনি নিয়ে সরকারের আলোচনা এগোয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, প্রস্তাবিত উন্মুক্ত পদ্ধতির খনি বাস্তবায়িত হলে ফুলবাড়ী শহরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার জনবসতি ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরির আশঙ্কাও প্রকাশ করেন পরিবেশবাদী ও স্থানীয় আন্দোলনকারীরা।
এই প্রেক্ষাপটে ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটি গঠিত হয়। তাদের প্রধান দাবির মধ্যে ছিল এশিয়া এনার্জির সব কার্যক্রম বন্ধ করা এবং ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি না করার নিশ্চয়তা দেওয়া।
পরবর্তীতে জাতীয় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারাও আন্দোলনে যুক্ত হন। আন্দোলন ক্রমেই বৃহত্তর জনসম্পৃক্ততায় রূপ নেয়।
২৬ আগস্টের রক্তাক্ত দিন
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, সেদিন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সমাবেশ শেষে মিছিল এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাওয়ের দিকে এগিয়ে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে গুলিতে তিনজন নিহত ও দুই শতাধিক মানুষ আহত হন।
ঘটনার পর ফুলবাড়ীসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের চাপের মুখে ৩০ আগস্ট তৎকালীন সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের আলোচনা হয়।
ছয় দফা দাবিতে সমঝোতা
আলোচনায় আন্দোলনকারীদের ছয় দফা দাবির বিষয়ে সমঝোতা হয় বলে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এর মধ্যে এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ী থেকে প্রত্যাহার এবং দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করার বিষয়টি ছিল অন্যতম।
তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব দাবির সবগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটির ফুলবাড়ী শাখার নেতারা মনে করেন, কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, তিন ফসলি জমি নষ্ট করে সাময়িক অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বড়পুকুরিয়া ও দেশের কয়লা সম্পদ
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পাঁচটি উল্লেখযোগ্য কয়লা ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো হলো দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ী, বিরামপুরের দিঘিপাড়া, জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ এবং রংপুরের পীরগঞ্জের খালাশপীর।
এর মধ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে ২০০৫ সাল থেকে ভূগর্ভস্থ স্যাফট বা টানেল পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। দেশের কয়লা সম্পদের বড় অংশ এখনো মাটির নিচে রয়েছে।
ফুলবাড়ী আন্দোলনের নেতাদের দাবি, বড়পুকুরিয়া খনির অভিজ্ঞতা থেকেও কৃষিজমি, বসতি ও পরিবেশের ওপর খনি কার্যক্রমের প্রভাব নিয়ে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।
মামলা প্রত্যাহারের দাবি
ফুলবাড়ী আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, আন্দোলনের সময় স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো এখনো পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়নি। তাঁরা এসব মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি আন্দোলনের ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
আন্দোলনের নেতাদের ভাষ্য, দাবি বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হলে ভবিষ্যতে ফুলবাড়ীবাসী আবারও ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নামতে পারেন।
ফুলবাড়ী ট্রাজেডির দুই দশক পূর্তিতে নিহতদের স্মরণ, তাঁদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন এবং দেশের কয়লা ও জ্বালানি নীতিতে পরিবেশ, কৃষি ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি নতুন করে সামনে এসেছে।




