ভারতের বহুল আলোচিত ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বোফর্স দুর্নীতি মামলায় হিন্দুজা ভাইদের এবং সুইডিশ প্রতিরক্ষা সংস্থা এবি বোফর্স-কে দেওয়া ক্লিনচিট বহাল রেখেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এর ফলে প্রায় চার দশক পুরোনো এই মামলাটি পুনরায় চালু করার আরেকটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো।
বৃহস্পতিবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০০৫ সালে দিল্লি হাই কোর্টের দেওয়া রায়কে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা একটি আবেদন খারিজ করে দেয়। ওই রায়ে হিন্দুজা ভাইদের বিরুদ্ধে চলমান সব ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ
বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ আবেদনটি শুনতে অস্বীকৃতি জানায়।
শুনানির সময় আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী শ্রীচাঁদ পি হিন্দুজা ও গোপীচাঁদ পি হিন্দুজার নাম আবেদন থেকে বাদ দেওয়ার জন্য সময় চাইলেও আদালত সেই অনুরোধ গ্রহণ করেনি। আদালত জানিয়ে দেয়, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলাকে আর টেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বিচারপতি পারদিওয়ালা মন্তব্য করেন, ২০০৫ সালেই দিল্লি হাই কোর্ট মামলার নিষ্পত্তি করেছে এবং পরে সিবিআইয়ের আবেদনও খারিজ হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন করে বিচার চালানোর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
২০০৫ সালের রায়ে কী বলা হয়েছিল?
২০০৫ সালের ৩১ মে দিল্লি হাই কোর্ট শ্রীচাঁদ, গোপীচাঁদ ও প্রকাশ হিন্দুজাসহ এবি বোফর্সকে সব ফৌজদারি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেছিল—
- সিবিআই পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
- হিন্দুজা ভাইদের বিরুদ্ধে বেআইনি কমিশন গ্রহণের অভিযোগের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
- সুইডিশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
- অপ্রামাণিক নথির ভিত্তিতে বিচার প্রক্রিয়া চালানো জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়।
তদন্ত পরিচালনায় সরকারি কোষাগার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলেও অভিযোগ প্রমাণে তা যথেষ্ট ছিল না বলেও আদালত পর্যবেক্ষণ করেছিল।
২০১৮ সালেও খারিজ হয়েছিল সিবিআইয়ের আবেদন
বোফর্স মামলা পুনরুজ্জীবিত করার আরেকটি উদ্যোগ ২০১৮ সালেও ব্যর্থ হয়। সে সময় দিল্লি হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সিবিআই যে আপিল করেছিল, তা সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেয়।
আদালত জানায়, প্রায় ১২ বছর বা ৪,৫২২ দিনের বিলম্বে আপিল করা হয়েছিল এবং সেই বিলম্বের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়া যায়নি।
কী ছিল বোফর্স মামলা?
১৯৮৬ সালের ২৪ মার্চ ভারত সরকার এবং সুইডিশ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এবি বোফর্সের মধ্যে প্রায় ১,৪৩৭ কোটি রুপি মূল্যের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য ৪০০টি হাউইটজার কামান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
পরের বছর, ১৯৮৭ সালে সুইডিশ রেডিও এক প্রতিবেদনে অভিযোগ তোলে যে, এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ভারতের কিছু রাজনীতিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাকে বেআইনি কমিশন দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ প্রকাশের পর বিষয়টি ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বড় বিতর্কের জন্ম দেয় এবং দীর্ঘদিন ধরে এটি অন্যতম আলোচিত দুর্নীতি মামলা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
আইনি লড়াই কার্যত শেষ
সর্বশেষ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দীর্ঘদিন আগে নিষ্পত্তি হওয়া এই মামলাকে নতুন করে চালু করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে বোফর্স মামলায় হিন্দুজা ভাইদের দেওয়া ক্লিনচিটের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই কার্যত সমাপ্ত হলো।




