বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পারাগ জৈনের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসেছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্র। দলটিতে ‘র’-এর কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ভারতের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের আমন্ত্রণেই প্রতিনিধি দলটি ঢাকায় এসেছে। সফরকালে বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের একাধিক বৈঠক হয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, ১১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও ভারতীয় প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নিরাপত্তা, জঙ্গি তৎপরতা এবং ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
কেন ঢাকায় ‘র’ প্রধান?
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের এ সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্যের মধ্যেই পারাগ জৈনের ঢাকা সফরের খবর সামনে এসেছে।
ভারতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা মহলে পারাগ জৈনকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আকাশ নজরদারি সংক্রান্ত বিষয়ে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা আলোচিত হয়েছে।
২০২৫ সালের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময়ও ভারতীয় গোয়েন্দা ব্যবস্থায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। এরপরই তাকে ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পারাগ জৈনের বর্তমান ঢাকা সফরের সুনির্দিষ্ট সরকারি কারণ এখনো প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সীমান্তে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে আলোচনা
বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, বৈঠকে ভারতীয় প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সম্ভাব্য জঙ্গি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে তথ্য উপস্থাপন করেছে।
সূত্রের দাবি, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার মদদে সীমান্তবর্তী এলাকায় জঙ্গি তৎপরতা বা ঘাঁটি গড়ে ওঠার বিষয়ে ভারতের কাছে কিছু গোয়েন্দা তথ্য ও নজরদারি-চিত্র রয়েছে। এসব তথ্য বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে বিনিময়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং যেকোনো ধরনের জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে সূত্রগুলো দাবি করছে।
তবে এসব জঙ্গি ঘাঁটি বা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার দাবির স্বাধীন কোনো যাচাই এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
শেখ হাসিনার নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্ব
পারাগ জৈনের ঢাকা সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য বাংলাদেশ প্রত্যাবর্তনের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার কথা বলা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে তার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, কোথায় তাকে রাখা হবে এবং আদালতে আত্মসমর্পণের পর তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী হবে—এসব বিষয়ে ভারত বিস্তারিত জানতে আগ্রহী।
ভারতের আশঙ্কা হিসেবে সূত্রগুলো বলছে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মতো বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে প্রত্যাবর্তনের আগে বাংলাদেশে তার নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে ভারত নিশ্চিত হতে চাইছে।
তবে শেখ হাসিনার ওপর এমন কোনো নির্দিষ্ট হত্যাচেষ্টার পরিকল্পনা বা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
কোথায় রাখা হবে শেখ হাসিনাকে?
সূত্রগুলোর দাবি, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে কোথায় রাখা হবে, কোন ধরনের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা হবে এবং কারা তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে—এসব বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
কারাগার, সাবজেল অথবা সেনানিবাসের মতো উচ্চনিরাপত্তা এলাকায় রাখার সম্ভাবনা নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন সমীকরণ?
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য তৈরি হলেও দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
এর আগে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের ভারত সফরকে ঘিরেও দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এবার ভারতের ‘র’ প্রধানের ঢাকা সফর সেই যোগাযোগকে আরও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও সীমান্ত নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ থাকা স্বাভাবিক।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঘিরে জল্পনা
শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলার প্রেক্ষাপটে তাকে প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনা রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়াবে না; বরং আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে।
তবে এ দাবির বিষয়ে বাংলাদেশ, ভারত বা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে তার প্রত্যাবর্তনের সময়সূচি নিয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় ভারতের বার্তা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ভারত একই সঙ্গে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
শেখ হাসিনার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে বলেও ভারতীয় পক্ষ থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্যও সীমান্ত নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য জঙ্গি তৎপরতা মোকাবিলা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে পারাগ জৈনের ঢাকা সফরকে বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য, বৈঠকে কী কী সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সরকারি পর্যায় থেকে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন সূত্রের দাবিকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।


