পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানভুক্তির প্রতিবাদে চাকমা ব্ল্যাক ডে পালিত

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানভুক্তির প্রতিবাদে চাকমা ব্ল্যাক ডে পালিত
মিজোরামে চাকমা ব্ল্যাক ডে

মিজোরাম প্রতিনিধি: ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রতিবাদ ও ঐতিহাসিক ঘটনাটি স্মরণ করে পালিত হয়েছে ‘চাকমা ব্ল্যাক ডে’।

রোববার (১৭ আগস্ট) ভারতের মিজোরাম রাজ্যের কমলনগরের সিএডিসি আর্ট অ্যান্ড কালচারাল হলে চাকমা ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (সিএনসিআই), মিজোরাম স্টেট কমিটির উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে সহযোগী হিসেবে অংশ নেয় সেন্ট্রাল ইয়াং চাকমা অ্যাসোসিয়েশন, সেন্ট্রাল মিজোরাম চাকমা স্টুডেন্টস ইউনিয়ন এবং চাকমা মহিলা সমিতি।

আয়োজকদের দাবি, ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট র‍্যাডক্লিফ বাউন্ডারি কমিশনের সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী অমুসলিম হওয়ায় অঞ্চলটি ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা করেছিল।

সিএনসিআই জানায়, ২০১৬ সালে আসামের গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির জাতীয় সম্মেলনে প্রতিবছর ১৭ আগস্ট ‘চাকমা ব্ল্যাক ডে’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চাকমা সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এ বছর ছিল কর্মসূচিটির ১১তম আয়োজন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চাকমা অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের (সিএডিসি) প্রধান নির্বাহী সদস্য (সিইএম) এবং সিএনসিআইয়ের জাতীয় সভাপতি ডি. জি. নিরুপম চাকমা।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঘটনাটি শুধু মৌখিক ইতিহাস বা আবেগের বিষয় নয়; এ বিষয়ে সমসাময়িক বিভিন্ন দলিল ও নথি রয়েছে। তিনি ১৯৪৭ সালের ১৬ আগস্ট নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের কার্যবিবরণীর উল্লেখ করে দাবি করেন, তৎকালীন কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহেরু পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।

নিরুপম চাকমার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই আলোচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ‘এক্সক্লুডেড এরিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং এর জনসংখ্যার বড় অংশ বৌদ্ধ ও হিন্দু হওয়ায় অঞ্চলটির সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার দাবি উঠেছিল।

অনুষ্ঠানের বক্তারা আরও বলেন, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট রাঙামাটিতে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে র‍্যাডক্লিফ কমিশনের সিদ্ধান্তে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হলে সেখানে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এই ঘটনাকে তাঁরা চাকমা জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন।

বক্তারা দেশভাগের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে ভূমি হারানো, বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংকটের প্রসঙ্গ উঠে আসে।

বিশেষভাবে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাওয়া এবং বহু মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে। বক্তারা বলেন, এসব ঐতিহাসিক ঘটনা চাকমা জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।

অনুষ্ঠানে সিএডিসির চেয়ারম্যান ডি. জি. ড. কালী কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, সিএনসিআই মিজোরাম স্টেট কমিটির সহসভাপতি ডি. জি. অমরস্মৃতি চাকমা, সেন্ট্রাল ইয়াং চাকমা অ্যাসোসিয়েশনের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ডি. জি. সন্তোষ চাকমা, সেন্ট্রাল মিজোরাম চাকমা স্টুডেন্টসের সিনিয়র সহসভাপতি ডাঙ্গুবি ইন্দু মতি দেওয়ান এবং সভাপতি ডি. জি. পরবেশ চাকমাসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।

এ সময় সিএডিসির বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি, গ্রাম পরিষদের সভাপতি, যুব সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা চাকমা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ঐতিহাসিক শিকড় সম্পর্কে সচেতন করার আহ্বান জানান তাঁরা।

অনুষ্ঠানে বক্তারা সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য আরও সুদৃঢ় করা এবং শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক উপায়ে চাকমা জনগোষ্ঠীর কল্যাণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করার আহ্বান জানান।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
সংবাদ প্রতিনিধি

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।