শ্রী আনন্দময়ী মায়ের ৪৪তম মহাপ্রয়াণ দিবস আজ

শ্রী আনন্দময়ী মায়ের ৪৪তম মহাপ্রয়াণ দিবস আজ
শ্রী আনন্দময়ী মায়ের ৪৪তম মহাপ্রয়াণ দিবস আজ

আধ্যাত্মিক সাধিকা শ্রী আনন্দময়ী মায়ের ৪৪তম মহাপ্রয়াণ দিবস আজ ২৭ আগস্ট। ১৯৮২ সালের এই দিনে তিনি দেহত্যাগ করেন। পরে উত্তর ভারতের হরিদ্বারের কনখল আশ্রমে গঙ্গার তীরে তাঁর দেহ সমাধিস্থ করা হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক জগতে শ্রী আনন্দময়ী মা ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর সাধনাজীবন, আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ও মানবকল্যাণের দর্শন বহু মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর সান্নিধ্যে এসেছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সাধক।

শৈশব থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকর্ষণ

শ্রী আনন্দময়ী মা ১৮৯৬ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার খেওড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল একই জেলার বিদ্যাকুট গ্রামে। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নির্মলা সুন্দরী। দাক্ষায়ণী, কমলা ও বিমলা নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন।

তাঁর পিতা বিপিনবিহারী ভট্টাচার্য পরবর্তীকালে মুক্তানন্দ গিরি নামে সন্ন্যাসজীবন গ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই নির্মলা সুন্দরীর মধ্যে আধ্যাত্মিকতার প্রতি গভীর আকর্ষণ লক্ষ্য করা যায়। হরিনাম সংকীর্তন শুনলে তিনি ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়তেন বলে জীবনীগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ রয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তাঁর জীবনে খুব বেশি ছিল না। মাত্র অল্প বয়সেই তাঁর জীবনে আধ্যাত্মিক ভাব ও সাধনার প্রকাশ ঘটতে থাকে।

বিবাহিত জীবন ও আধ্যাত্মিক সাধনা

১৯০৮ সালে বিক্রমপুরের রমণীমোহন চক্রবর্তীর সঙ্গে নির্মলা সুন্দরীর বিবাহ হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর স্বামী সন্ন্যাস গ্রহণ করে ভোলানাথ নামে পরিচিত হন।

প্রথম দিকে তাঁর ভাবাবেশকে অনেকে মানসিক অসুস্থতা বা হিস্টিরিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। পরে প্রাণগোপাল মুখোপাধ্যায় তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থাকে মহাভাবের সাধনা হিসেবে উপলব্ধি করেন।

১৯২৪ সালে রমণীমোহন ঢাকার নবাবের বাগানের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেলে নির্মলা সুন্দরী তাঁর সঙ্গে ঢাকায় আসেন। শাহবাগে অবস্থানকালে তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা আরও ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে।

‘আনন্দময়ী মা’ নামের পরিচিতি

ঢাকার শাহবাগ ও সিদ্ধেশ্বরী অঞ্চলে তাঁর আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সিদ্ধেশ্বরীতে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠার পর সেখানে তাঁর ভাবাবিষ্ট সাধনাকে কেন্দ্র করে ভক্তদের মধ্যে গভীর শ্রদ্ধা তৈরি হয়।

এই সময় থেকেই তিনি ‘আনন্দময়ী মা’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ঢাকার রমনায় তাঁর আশ্রম গড়ে ওঠে এবং ক্রমে তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারতেও বিস্তৃত হয়।

তাঁর ভাবধারায় আকৃষ্ট হয়েছিলেন মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ, ড. ত্রিগুণা সেনসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের সঙ্গেও তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শন ও নৃত্যের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

আনন্দময়ী মায়ের দর্শনে জগৎ ছিল এক ধরনের নৃত্যময় প্রকাশ। জীবনের প্রতিটি স্পন্দন, এমনকি বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গমের মধ্যেও তিনি এক ধরনের ছন্দময় গতির উপস্থিতি অনুভব করতেন। তাঁর এই দর্শনে জীবাত্মা ও পরমাত্মার সম্পর্কের একটি আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

ভারতজুড়ে আধ্যাত্মিক সাধনার বিস্তার

১৯৩২ সালে আনন্দময়ী মা তাঁর স্বামীর সঙ্গে উত্তর ভারতের দেরাদুনে চলে যান। এরপর ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করে তিনি মানুষকে আধ্যাত্মিক জীবন ও সাধনার প্রতি উৎসাহিত করেন।

প্রাচীন তীর্থস্থান নৈমিষারণ্যের পুনর্জাগরণেও তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন স্থানে মন্দির, যজ্ঞ, কীর্তন ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।

বাংলাদেশের খেওড়া ও রমনা থেকে শুরু করে ভারতের বারাণসী, কনখলসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁর নামে আশ্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কন্যাপীঠ ও অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শন

আনন্দময়ী মায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—মানুষ যে অবস্থাতেই থাকুক, নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে। তাঁর দর্শনে সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং নিজের দায়িত্ব পালন করেই ঈশ্বরসাধনার পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তাঁর একটি বহুল উদ্ধৃত বাণী হলো—

“সংসারটা ভগবানের; যে যে অবস্থায় আছে, সেই অবস্থায় থেকে কর্তব্যকর্ম করে যাওয়াই মানুষের কর্তব্য।”

তিনি আরও বলতেন, খণ্ড আনন্দে মানুষের প্রাণ পরিতৃপ্ত হয় না; তাই মানুষ অখণ্ড আনন্দের সন্ধান করে। তাঁর নিজের জীবনও সেই অখণ্ড আনন্দের অনুসন্ধান ও সাধনাকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়েছিল বলে তাঁর অনুসারীরা মনে করেন।

ভক্তদের কাছে বহুরূপে প্রকাশ

আনন্দময়ী মায়ের ভক্তদের মধ্যে তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থাকে ঘিরে নানা অভিজ্ঞতার কথা প্রচলিত রয়েছে। কেউ তাঁকে ছিন্নমস্তা, কেউ ভুবনেশ্বরী, আবার কেউ সরস্বতীর রূপে অনুভব করেছেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।

তাঁর স্বামী ভোলানাথও পরবর্তীকালে তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থার গভীরতা উপলব্ধি করেছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। ভক্তদের কাছে আনন্দময়ী মা হয়ে ওঠেন মাতৃস্বরূপ এক আধ্যাত্মিক আশ্রয়।

মহাপ্রয়াণ ও উত্তরাধিকার

১৯৮২ সালের ২৭ আগস্ট শ্রী আনন্দময়ী মা মহাসমাধিতে বিলীন হন। হরিদ্বারের কনখলে গঙ্গার তীরে তাঁর সমাধি আজও ভক্ত ও অনুসারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।

তাঁর জীবন ও সাধনা ধর্মীয় পরিমণ্ডলের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আশ্রম ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তাঁর ভাবধারার ধারক হিসেবে কাজ করে চলেছে।

শ্রী আনন্দময়ী মায়ের জীবন মানুষের অন্তর্গত আনন্দের অনুসন্ধান, কর্তব্যনিষ্ঠা, আত্মসাধনা ও ঈশ্বরচেতনার প্রতি এক গভীর আহ্বান হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁর মহাপ্রয়াণ দিবসে তাই ভক্ত ও অনুসারীরা তাঁর জীবন, বাণী ও আধ্যাত্মিক আদর্শকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

Tags:

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
সংবাদ প্রতিনিধি

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।