হরমুজ প্রণালীকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে হরমুজ প্রণালীর একটি মানচিত্র প্রকাশ করে এমন দাবি করেন তিনি। একই সময়ে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সমঝোতার শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুনরায় স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।
ট্রাম্পের প্রকাশ করা মানচিত্রে হরমুজ প্রণালীকে ‘নিউ ইউএস টেরিটরি’ বা ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানচিত্রে ইরান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অংশও দেখানো হয়েছে। এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইরানের পাল্টা অবস্থান
ট্রাম্পের দাবির বিপরীতে তেহরান স্পষ্ট করেছে, হরমুজ প্রণালীর বিষয়ে ইরান তার অবস্থান পরিবর্তন করছে না। ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নির্ধারিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত জলপথটি স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে না।
ইরানের আলোচনায় থাকা শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আরোপিত তেল-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি ট্রাম্পের মানচিত্র ও দাবির সমালোচনা করেছেন। তেহরানের পক্ষ থেকে এটিকে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন দাবি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের দাবি, হরমুজ ‘চলমান’
অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালী খোলা রয়েছে এবং সেখানে জাহাজ চলাচল অব্যাহত আছে। তাঁর আরেকটি বক্তব্য অনুযায়ী, জলপথে থাকা মাইনগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে অথবা বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
তবে একই সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। ফলে জলপথটি বাস্তবে কতটা নিরাপদ এবং স্বাভাবিকভাবে কার্যকর—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
জাহাজে ফের হামলা
ট্রাম্পের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO)।
ঘটনায় জাহাজটির ইঞ্জিন রুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সর্বশেষ পাওয়া প্রতিবেদনে একজন নাবিক নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং ওমানের কোস্টগার্ড অন্য ক্রু সদস্যদের সহায়তা করেছে। হামলার জন্য কে দায়ী, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী?
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে এখানে দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোর রপ্তানি নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের দামেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
চলমান মার্কিন-ইরান উত্তেজনা এবং হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা
হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ এখন কেবল দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নৌ নিরাপত্তার বিষয়।
একদিকে ট্রাম্প হরমুজকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন ও সচল হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে ইরান জলপথটির ওপর নিজেদের অবস্থান বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার শর্ত পূরণের দাবি করছে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজে নতুন হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে—বিশেষ করে বৈশ্বিক তেলবাজার, জাহাজ চলাচল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে।




