ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে তিন দিনের সফরে ভারতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে নয়াদিল্লির পালাম বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেন তিনি। মোদি-পুতিন বৈঠক
বিমানবন্দরে রুশ প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং।
ভারতের ২০২৬ সালের ব্রিকস সভাপতিত্বের অধীনে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে এবারের শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর নেতারা বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করবেন।
পুতিনের ভারত সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হচ্ছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। এ বৈঠকে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
মোদি-পুতিন বৈঠকে গুরুত্ব পাবে যেসব বিষয়
রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় এজেন্ডা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবেন। রাশিয়ায় ভারতীয় কোম্পানির বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রুশ বাজারে ভারতীয় ব্যবসার সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।
আরও পড়ুনঃ বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টির আভাস
প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের সু-৫৭ যুদ্ধবিমান নিয়ে ভারতের আগ্রহ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও ব্রহ্মোসসহ চলমান বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রকল্প নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতবিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
পারমাণবিক জ্বালানি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। রুশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতে নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে মস্কো নয়াদিল্লির সঙ্গে আরও সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহী।
রুশ তেল ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য
ভারত-রাশিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রুশ তেল আমদানির বিষয়টি বর্তমানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের অন্যতম বড় উপাদানে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ শেষ হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন
এর পাশাপাশি জাতীয় মুদ্রায় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। ক্রেমলিনের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাণিজ্যিক লেনদেন জাতীয় মুদ্রায় সম্পন্ন হচ্ছে।
ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং আন্তঃসীমান্ত লেনদেন আরও সহজ করার বিষয়টি তাই ব্রিকসের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ব্রিকসে ডিজিটাল মুদ্রার সংযোগের উদ্যোগ
এবারের ব্রিকস সম্মেলনে আলোচনার অন্যতম সম্ভাব্য বিষয় হলো সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা বা CBDC-এর মধ্যে সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ।
ভারত এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী। এর মূল লক্ষ্য ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসীমান্ত অর্থ লেনদেনকে আরও দ্রুত, সহজ ও কার্যকর করা।
আরও পড়ুনঃ বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব দিবস: স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো ভাষণের ঐতিহাসিক বার্তা
তবে চীন ও ভারতের মধ্যকার বিভিন্ন মতপার্থক্য, সদস্য দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থার ভিন্নতা এবং প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভারত অবশ্য এটিকে মার্কিন ডলারের বিকল্প কোনো একক মুদ্রা চালুর উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করার একটি ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি
মোদি-পুতিন বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টাও গুরুত্ব পেতে পারে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেন সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে ভারতের উদ্যোগের প্রতি সমর্থনের কথা জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের প্রভাব নিয়েও আলোচনা হতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং পরিবহনব্যবস্থার ওপর সংঘাতের প্রভাব ব্রিকস নেতাদের আলোচনায় স্থান পেতে পারে।
পুতিনকে ঘিরে দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা
ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সম্মেলন ঘিরে প্রায় ৩০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এবারের সম্মেলনে অংশ নিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও ভারতে আসছেন। ২০২০ সালের সীমান্ত উত্তেজনার পর তাঁর এই সফরকে ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে পুতিনের সফরের পাশাপাশি মোদি-শি বৈঠকের সম্ভাবনাও সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুনঃ আমেরিকার ইতিহাসে ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলার দিন আজ
সব মিলিয়ে পুতিনের তিন দিনের ভারত সফর শুধু ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিরক্ষা ও পারমাণবিক সহযোগিতা থেকে শুরু করে রুশ তেল, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, জাতীয় মুদ্রায় লেনদেন এবং ইউক্রেনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত-রাশিয়ার অবস্থান ও সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণেও এ সফর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।




